কী আছে সাবেক আইজিপি সুনামগঞ্জের মামুনের ভাগ্যে?

কওমি কণ্ঠ ডেস্ক :

পুলিশের সর্বোচ্চ পদে ছিলেন সুনামগঞ্জের চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তার আমলেই সংঘটিত হয়েছিল চব্বিশের জুলাই গণহত্যা। ছাত্র-জনতার এ আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচার গুলি কিংবা নৃশংসতার যেন কোনো ইয়াত্তা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটতেই কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে তৎকালীন এই আইজিপির নাম। তবে, মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আসামি হিসেবে থাকলেও দায় কাঁধে নিয়ে তিনি রাজসাক্ষী হয়ে যান। আদালতে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন নিজেরই একসময়ের কর্তা শেখ হাসিনা আর আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে। সামনে এনেছেন বহু অজানা তথ্য। সত্য উদঘাটনের বিনিময়ে কি তিনি খালাস পাচ্ছেন, নাকি পূর্ণ সাজা পাচ্ছেন— এমন জল্পনা অনেকের মনে উঁকি দিচ্ছে।

তথ্য বলছে, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বেশ কয়েকটি মামলা চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এর মধ্যে একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ যুক্তিতর্ক শেষে এখন মামলাটি রায়ের অপেক্ষায়। সেই দিনক্ষণ ঠিক হবে আগামী ১৩ নভেম্বর। এর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে চূড়ান্ত ফলাফল। এ মামলায় হাসিনা-কামালের চরম দণ্ড বা সর্বোচ্চ সাজা চাইলেও, মামুনের শাস্তি নিয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে প্রসিকিউশন। এমনকি তার অ্যাকুইটাল (খালাস) চেয়েছেন নিজের অর্থে নিয়োগ করা আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।

ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১০ জুলাই হাসিনা-কামাল-মামুনের বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে এ আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। ওই দিন তাদের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগ পড়েন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। তখন অনেকটা অনুতপ্তের ছাপ দেখা যায় আসামির কাঠগড়ায় থাকা মামুনের কপালে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘দোষী নাকি নির্দোষ’— এমন কথা জানতে চাওয়া হয়। আদালতকে জবাব দিতে পকেটে রাখা এক টুকরো কাগজ দেখে বেশ জোরালো কণ্ঠে দায় স্বীকার করে নেন পুলিশের সাবেক এই মহাপরিদর্শক।

‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হয়ে সবকিছু প্রকাশ করার কথাও জানান ট্রাইব্যুনালকে। ইংরেজিতে তিনি বলেছিলেন, ‘আই প্লিড গিল্টি। আই অ্যাম উইলিং টু ভলান্টারি ডিসক্লোজ ট্রু অ্যান্ড ফুল ডিসক্লোজার অব দ্য হোল অব দ্য সারকামস্ট্যান্সেস উইদিন মাই নলেজ রিলেটিং টু দ্য ইনস্ট্যান্স কেস।’ যার বাংলায় অনেকটা এমন দাঁড়ায়— ‘আমি দোষ স্বীকার করছি। আমি স্বেচ্ছায় সত্য প্রকাশ করব। এ মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত আমার জানা সব পরিস্থিতির কথা তুলে ধরব।’ এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর ডায়াসে দাঁড়িয়ে সব ফাঁস করে দেন চৌধুরী মামুন। জুলাই-আগস্ট গণহত্যাযজ্ঞ ঘিরে শেখ হাসিনার সরকারের নীলনকশা, আন্দোলন দমনে ছক কষতে প্রতি রাতে আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় হওয়া বৈঠক, গ্যাং অব ফোরের সদস্যদের নামসহ অনেক অজানা তথ্যের ঝাঁপি খোলেন তিনি। মারণাস্ত্র ব্যবহারে অতি-উৎসাহী ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান ও ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদকে নিয়েও দেন বিস্ফোরক তথ্য।

ডিএমপির এই সাবেক কমিশনার ও এসবিপ্রধান মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনীতে দুটি গ্রুপ গড়ে উঠেছিল বলেও জবানবন্দিতে জানিয়েছেন মামুন। এছাড়া, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের তুলে আনার প্রস্তাবদাতাদের নাম, হেলিকপ্টার-ড্রোন ওড়ানো, র‌্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল কিংবা আয়নাঘরখ্যাত গোপন বন্দিশালায় বিরোধী মতাদর্শের লোকদের তুলে নিয়ে নির্মমতার বিবরণও তুলে ধরেন ট্রাইব্যুনালের সামনে। এমনকি গোপালগঞ্জ বলয় দ্বন্দ্ব ঢাকতে আইজিপি পদে নিজের মেয়াদ পরপর দুবার বাড়ানো হয় বলেও জানান তিনি। সবশেষ পুলিশে ৩৬ বছরের কর্মজীবনের কথা টেনে গণহত্যার শিকার প্রত্যেক পরিবার-আহতসহ ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা চান এই রাজসাক্ষী।

সূত্রমতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে দেশের ৪১ জেলার ৪৩৮ স্থানে হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৫০-এরও বেশি জেলায় ব্যবহৃত হয় মারণাস্ত্র। গুলি ছোড়া হয়েছিল ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড। শুধুমাত্র ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছিল ঢাকায়। মানুষের প্রাণ কাড়তে ব্যবহৃত হয়েছিল এলএমজি, এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগান, রিভলভারসহ অন্যান্য অস্ত্র। এর মধ্যে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে সবচেয়ে বেশি গুলি চালানোর অভিযোগ পুলিশের দিকে। নিজের মেয়াদকালে হওয়ায় এমন দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না সাবেক আইজিপি মামুন। কারণ, আন্দোলন দমনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের বাসায় নিয়মিত হওয়া সব ধরনের ষড়যন্ত্র-পরিকল্পনার বৈঠকে তিনিও অংশ নিতেন। সেক্ষেত্রে বাকি অপরাধীদের মতোই তার সাজা হওয়া উচিত বলে মনে করেন কেউ কেউ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, পেশাগত জীবনে আওয়ামী লীগ সরকারের অন্য আইজিপিদের চেয়ে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন কিছুটা ব্যতিক্রম ছিলেন। নিষ্ঠাবান হওয়ায় বাহিনীর অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তাকে পছন্দ করতেন। তবে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে চাইলেই তিনি কিছু একটা করতে পারতেন। কারণ, পুরো বাহিনী তার অধীনে ছিল। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। বরং প্রধান হিসেবে তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নির্দেশেই ছাত্র-জনতার উপর গুলি ছুড়তে অতি-উৎসাহী হয়ে উঠেন অধস্তনরা। এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো জঘন্য অপরাধ করে রাজসাক্ষী হয়ে যদি নিস্তার বা কম সাজা পান, তাহলে যারা গ্রেপ্তার রয়েছেন, তাদের মাঝে এক ধরনের প্রশ্ন জাগবে।

ট্রাইব্যুনালে দেওয়া মামুনের সাক্ষ্যে সত্য উন্মোচিত হয়েছে— দাবি প্রসিকিউশনের। রাজসাক্ষী হওয়ার সময় দেওয়া নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছেন বলেও মনে করেন তারা। নিজের অর্থে নিয়োগ করা আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদও একই সুরে কথা বলেছেন।

ট্রাইব্যুনালের মামলায় শেখ হাসিনা সব অপরাধীর প্রাণভোমরা ছিলেন— এমন মন্তব্য করেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এ মামলার যুক্তিতর্ক শেষে তিনি বলেছিলেন, ‘আইন অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে চরম দণ্ড দেওয়া শ্রেয়। আর গ্যাং অব ফোরের সদস্য ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তার বাসায় বসেই জুলাই হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা করা হতো। ড্রোন ওড়ানোসহ হেলিকপ্টারে মারণাস্ত্র ছোড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। কমান্ডিংয়ের দিক থেকে এ মামলায় তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে। তারও সর্বোচ্চ সাজা চাওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। তবে, আইন অনুযায়ী রাজসাক্ষী হয়ে আদালতকে তথ্য দিয়ে বা সত্য উদঘাটনে সাহায্য করেছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। এজন্য তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন আদালত।’

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ বলেন, “পুরোপুরি সত্য উন্মোচনের শর্তে শেখ হাসিনার মামলায় মামুনকে অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হিসেবে ডিক্লেয়ার (ঘোষণা) করেছেন ট্রাইব্যুনাল। সেই শর্ত পালন করলেই আইনে বর্ণিত সুবিধা পাবেন তিনি। ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তার জবানবন্দি অবশ্যই ‘ট্রু অ্যান্ড ফুল ডিসক্লোজার’ ছিল। অর্থাৎ, শর্ত অনুযায়ী নিজের জ্ঞানে জানা সব কিছুই তিনি প্রকাশ করেছেন বিচারের স্বার্থে। এতে কোনো অত্যুক্তি বা কমতি ছিল না। কারণ, এ মামলায় যেসব সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন, তাদের পক্ষে এতটুকুই দেখা সম্ভব ছিল, যা তারা দেখেছেন কিংবা শুনেছেন। কিন্তু ভেতরের খবর তথা প্রশাসনিক দিক থেকে বা উপর মহলে যে ধরনের সিদ্ধান্ত ছিল, সেসব এই সাক্ষীদের পক্ষে প্রিজুম করা সম্ভব নয়। চৌধুরী মামুন যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব।”

সাজা পাবেন নাকি খালাস— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন-১৯৭৩ এর ১৫ ধারায় অ্যাপ্রুভারের বিধান থাকলেও স্পষ্টভাবে বলা নেই পরিণতি কী হবে। ট্রাইব্যুনালে সিআরপিসি (ফৌজদারি কার্যবিধি) প্রযোজ্য নয়। তবে, সিআরপিসিতে বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ যখন কাউকে রাজসাক্ষী হিসেবে ঘোষণা করা হবে এবং আদালত সন্তুষ্ট হবেন যে, সে তার জানা সব সত্য উন্মোচিত করেছে, তখন তার পরিণতি হবে অ্যাকুইটাল বা খালাস। আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সুবিধা পেলে মামুনও খালাস পাবেন বলে আমার প্রত্যাশা।’

রাজনৈতিক কোনো দেনদরবার হয়েছে কি না— জানতে চাইলে মামুনের এই আইনজীবী বলেন, “দেনদরবারের প্রশ্নই ওঠে না। ট্রাইব্যুনালের সামনে তিনি ‘গিল্টি প্লিড’ করেছেন, আবেদন জানিয়েছেন। আমি তার আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। ওপেন কোর্টে তার ‘গিল্টি প্লিড’ গ্রহণ করে তাকে শর্তসাপেক্ষে রাজসাক্ষী হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। জবানবন্দিতে সব বলেছেন তিনি। এখন ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা করবেন। সন্তুষ্ট হলে আইনের যে সুবিধা পাওয়ার হকদার, এর সর্বোচ্চটাই তিনি পাবেন। এছাড়া, বিচার স্বচ্ছভাবেই হচ্ছে।”

(মূল রিপোর্ট : ঢাকা পোস্ট)