কওমি কণ্ঠ ডেস্ক :
সিলেট মহানগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা ও অপসারণ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে বছরের পর বছর ধরে। একাধিকবার অপসারণের উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে পারেনি সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। ছয় বছর আগে ৩০টি ভবনের তালিকা করে অপসারণ শুরু করেছিলেন তৎকালীন মেয়র। কয়েকটি ভবন ভাঙার পর তা আটকে যায়।
এর আগে ২০১৬ সালে ভবনের তালিকা ও অপসারণের চেষ্টা করে নগর ভবন। ২০২১ সালে ৪২ হাজার ভবন জরিপ করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করার উদ্যোগ নিলেও অর্থাভাবে সেই জরিপ কাজ থেমে যায়। ভূমিকম্প হলে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে নড়েচড়ে বসে সিসিক। সর্বশেষ গত ২১ নভেম্বর দেশে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার পর যৌথ উদ্যোগে সভা করে সিসিক। গত ২৪ নভেম্বর সিটি করপোরেশনের ভূমিকম্পের পূর্ব প্রস্তুতি ও পরবর্তী করণীয়-বিষয়ক মতবিনিময় সভায় ২৪টি ভবন অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভায় বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে এক সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহায়তায় ভবন অপসারণের কথা জানালেও ভাঙার কাজ শিগগির শুরু করা হবে এমন কোনো লক্ষণ নেই। জাতীয় কমিটির নির্দেশনাসহ ভবনের সর্বশেষ অবস্থার খবর নেওয়ার পর উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার। তিনি জানান, ভবনগুলো ফাইল দেখার পর অপসারণের উদ্যোগ নেবেন। জাতীয় কমিটির মাধ্যমে এসব ভবন প্রকৌশলীদের দিয়ে ‘টেকনিক্যাল’ পরীক্ষা করে দেখা হবে।
প্রথমবার ২০১৬ সালে ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে নগরীর ৩৪টি ভবনের তালিকা করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে আবার ৩০টি ভবনের তালিকা করে অপসারণ শুরু করেন তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ অপসারণ করা কয়েকটি ভবনের মধ্যে ছিল মিউনিসিপ্যাল মার্কেট, নগরীর হাওয়াপাড়া, শাহী ইদগাহ ও মদিনা মার্কেট এলাকার ৫-৬টি ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন। ওই সময় অভিযোগ ওঠে, ভবন মালিক ও ভবনের ব্যবসায়ীরা সিসিকের সঙ্গে আঁতাত করে পার পেয়ে যান। কেউবা আবার উচ্চ আদালতে ভবন রক্ষায় রিট পিটিশন করেন। এরমধ্যে পৌর বিপণি মার্কেট ভাঙা নিয়ে আদালতে যান সেখানকার ব্যবসায়ীরা।
সেই তালিকার বাকি ২৪টি ভবন আর অপসারণ না হওয়ায় নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভবনগুলো হলো–কালেক্টরেট ভবন-৩, সমবায় ব্যাংক ভবন, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার সাবেক কার্যালয় ভবন, সুরমা মার্কেট, বন্দরবাজারের সিটি সুপারমার্কেট, মধুবন মার্কেট, জিন্দাবাজারের মিতালী ম্যানশন, দরগা গেইটের আজমীর হোটেল, কানিশাইল এলাকার মান্নান ভিউ, শেখঘাটের শুভেচ্ছা-২২৬, চৌকিদেখী এলাকার ৫১/৩ সরকার ভবন, যতরপুরের নবপুষ্প-২৬/এ, জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশন, পুরান লেন এলাকার ৪/এ কিবরিয়া লজ, খারপাড়ার মিতালী-৭৪, মির্জাজাঙ্গালের মেঘনা-এ-৩৯/২, পাঠানটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বাগবাড়ির ওয়ারিছ মঞ্জিল একতা-৩৭৭/৭, হোসেইন মঞ্জিল একতা-৩৭৭/৮ ও শাহনাজ রিয়াজ ভিলা একতা-৩৭৭/৯, বনকলাপাড়া এলাকার নূরানী-১৪, ধোপাদিঘী দক্ষিণপাড়ের পৌর বিপণি ও পৌর শপিং সেন্টার, লেচুবাগান এলাকার প্রভাতী ৬২/বি (শ্রীধরা হাউস)।
এদিকে, কোন ভবন কী কারণে ঝুঁকিপূর্ণ তা উল্লেখ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর। তিনি জানান, ভবন জরিপ ও প্রাথমিক বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞ দল ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে। জানা গেছে, এসব ভবনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের ৩ নম্বর ভবনটি প্রকৌশলগত ত্রুটি, জিন্দাবাজারের মিতালী ম্যানশন মার্কেট হেলে পড়া, সমবায় ব্যাংক ও মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার সাবেক কার্যালয় অনেক পুরোনো হওয়াসহ নানা কারণে ২৪টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখা হয়েছে।
২০২১ সালে সিসিক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (শাবিপ্রবি) বিভিন্ন দপ্তরের সহায়তায় ৪২ হাজার ভবন জরিপের উদ্যোগ নেয়। এতে ১৫-২০ কোটি টাকার প্রয়োজন ছিল। অর্থাভাবে জরিপ আটকে যায়। তখন মাত্র ৬ হাজার ভবনের জরিপ করা হয়েছিল। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ কাজে নেতৃত্ব দেন শাবিপ্রবির পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জজির বিন আলম। তিনি ওই সময় জানান, নগরীর ৬ হাজার ভবন জরিপ করে ২৩টি ভবনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পেয়েছেন। তবে প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আরও অনেক বেশি হবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে নগরবাসী বাস করুক আমরা চাই না। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৪টি ভবন ভাঙতে সিসিক, জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস কাজ শুরু করবে।’
(মূল রিপোর্ট : সমকাল)