ইমরান আহমদ, গোলাপগঞ্জ (সিলেট) :
গোলাপগঞ্জ উপজেলায় একাধিক রেস্টুরেন্টে নিয়মবহির্ভূতভাবে কাপড়ের মেলা ও বাণিজ্যিক প্রদর্শনীর আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজারের স্থায়ী ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব অবৈধ ‘পপ-আপ মেলা’ নিয়মিত বাজার ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী দোকানদারদের মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, রেস্টুরেন্টের ট্রেড লাইসেন্স মূলত খাবার পরিবেশন ও সংশ্লিষ্ট সেবার জন্য ইস্যু করা হয়। অথচ সেই লাইসেন্স ব্যবহার করেই কাপড়, জুতা, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে, যা সরাসরি লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন এবং বিদ্যমান বাণিজ্য আইন ও স্বাস্থ্যবিধির পরিপন্থী।
গোলাপগঞ্জ বাজারের একাধিক দোকান মালিক বলেন, “আমরা বছরের পর বছর দোকান ভাড়া, কর, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীর বেতন ও লাইসেন্স ফি দিয়ে নিয়ম মেনে ব্যবসা করছি। অথচ কিছু ব্যক্তি মাত্র কয়েক দিনের জন্য রেস্টুরেন্টে মেলা বসিয়ে আমাদের কাস্টমার ভাগ করে নিচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ অন্যায্য ও অসম প্রতিযোগিতা।”
ব্যবসায়ীরা জানান, বিশেষ করে উৎসব ও মৌসুমি সময়কে কেন্দ্র করেই এসব মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। ফলে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিক্রির সময়েই স্থায়ী দোকানগুলো বিক্রি হারাচ্ছে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে লোকসানের কারণে দোকান চালানো নিয়েই চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনে দোকান বন্ধ হওয়া, কর্মচারী ছাঁটাই এবং বাজারে বেকারত্ব বাড়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।
এদিকে জনবহুল গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকায় রেস্টুরেন্টে মেলার আয়োজনের ফলে অতিরিক্ত মানুষের ভিড়, যানজট ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব আয়োজনের সময় সড়কে চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং পুরো এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা জননিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
একাধিক রেস্টুরেন্টে একের পর এক মেলা আয়োজনের ঘটনায় বাজার বণিক সমিতি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, নিয়মিতভাবে বণিক সমিতিকে চাঁদা দেওয়ার পরও ব্যবসায়ীদের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি প্রশাসনের নিরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন—প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া জনবহুল এলাকায় কীভাবে এভাবে রেস্টুরেন্টে কাপড়ের মেলা আয়োজন করা হচ্ছে?
বাজার বণিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিলাল আহমদ জানান, রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত এসব অনিয়মিত মেলা বন্ধের দাবিতে গত ১১ ডিসেম্বর গোলাপগঞ্জ থানা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগের পর এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত বা মৌখিক জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীদের জীবিকা আজ হুমকির মুখে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ব্যবসায়ীরা আর নীরব থাকতে পারবেন না।”
এ বিষয়ে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরিফুল ইসলাম বলেন, “রেস্টুরেন্টে মেলা আয়োজন সংক্রান্ত কোনো লিখিত অভিযোগ আমি এখনো পাইনি। তবে বিষয়টি শুনেছি। আমি নতুন যোগদান করেছি। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, উভয় পক্ষ আলোচনায় বসলে সমস্যা সমাধান হতে পারে এবং বণিক সমিতি এ ধরনের উদ্যোগ নিলে ভালো হবে।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল মাহমুদ ফুয়াদ বলেন, “এ বিষয়ে আমার জানা নেই। কেউ অভিযোগও করেনি। আর মেলার অনুমতি জেলা প্রশাসক অফিস থেকে নিতে হয়।”
রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স অনুযায়ী কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। কেউ লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যবসায়ীরা জানান, নভেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে হেতিমগঞ্জ বাজারের পাশে আমিন কনভেনশন হলে একটি মেলা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নভেম্বরের শেষ দুই দিন ও ডিসেম্বরের প্রথম দিন গোলাপগঞ্জ পৌর শহরের লাযিয রেস্টুরেন্ট ও পার্টি সেন্টারে মেলা আয়োজন করা হয়। আগামী ২৫–২৭ ডিসেম্বর পৌর শহরের একেবারে নিকটে সানরাইজ রেস্টুরেন্ট ও পার্টি সেন্টারে আরও একটি মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া সামনে আরও বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে এ ধরনের মেলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের আশ্বাসে আপাতত অপেক্ষা করছেন। তবে দ্রুত দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ না এলে গোলাপগঞ্জের বাজার ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সচেতন মহলের মতে, সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং স্থায়ী ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় রেস্টুরেন্টে নিয়মবহির্ভূত বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের নিরপেক্ষ, দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।