কওমি কণ্ঠ ডেস্ক :
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেওয়া ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে বহু মানুষ নিখোঁজ হন। তাদের অনেকের মরদেহ অজ্ঞাত পরিচয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে স্বজনরা প্রিয়জনের কোনো খোঁজ না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটান।
আন্দোলনে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের সন্ধানে একের পর এক কর্মসূচিতে অংশ নেন পরিবারের সদস্যরা।
নিখোঁজদের ছবি হাতে দাঁড়িয়ে অন্তত প্রিয় মানুষের কবরটি একনজর দেখার আকুতি জানিয়ে আসছিলেন তারা। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘ এক মাসের প্রচেষ্টায় রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা অজ্ঞাত শহীদদের মধ্যে আটজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার উপস্থিতিতে স্বজনদের কাছে কবর হস্তান্তর করা হয়।
দেড় বছর পর সন্তানের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন উত্তরায় নিহত ফয়সাল সরকারের মা হাজেরা বেগম, যাত্রাবাড়ীতে নিহত সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম, মাহিমের মা জোসনা বেগম এবং তার স্ত্রী। এ সময় রায়েরবাজার কবরস্থানে এক হৃদয়বিদারক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
যাত্রাবাড়ীর কাজলায় আন্দোলনে গিয়ে নিহত সোহেল রানার মা ছেলের কবরের সামনে নিজেকে সামলাতে পারেননি। ছেলের স্মৃতি তুলে ধরে আহাজারি করে তিনি বলেন, বাবা, তুই আমাকে কিছুই বলে গেলি না।
আমার পায়ে তেল মালিশ করে ঘুমিয়ে রেখে গেলি। আর তোকে আর পেলাম না।
শনাক্ত হওয়া আট শহীদের স্বজনদের আহাজারিতে পুরো কবরস্থান ভারী হয়ে ওঠে। কেউ কবরে পানি দিচ্ছেন, কেউ মাটি ছুঁয়ে দেখছেন, কেউবা কবরে লাগানো গাছে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয়জনের কবর পেয়ে চোখের পানিতে ভাসছিল স্মৃতির গল্প।
শনাক্ত হওয়া জুলাই যোদ্ধারা হলেন মাদারটেকে নিহত কাবিল হোসেন (৫৮), যাত্রাবাড়ীর মোহাম্মদবাগ এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী সোহেল রানা (৩৮), উত্তরায় নিহত আসাদুল্লাহ (৩১), বাড্ডায় নিহত পারভেজ ব্যাপারী (২৩), যাত্রাবাড়ীতে নিহত রফিকুল ইসলাম (২৯), মোহাম্মদপুরে নিহত মাহিম (৩২), উত্তরায় নিহত ফয়সাল সরকার (২৬) এবং রফিকুল ইসলাম (৫২)।
কবর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ জানান, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১১৪টি কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও প্রোফাইলিং করা হয়েছে। নয়টি পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আটজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। একজন শহীদ জিলানির পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি। তিনি সৌদি আরবের মদিনায় বসবাস করতেন এবং ছুটিতে দেশে এসে আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও জানান, ডিএনএ প্রোফাইলিং শেষে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পুনরায় দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর বিশেষ প্রস্তুতি শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্তে মরদেহ উত্তোলন শুরু করে সিআইডি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও কনসালট্যান্ট ড. লুইস ফনডেরিডারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই নমুনা সংগ্রহের কাজ পরিচালিত হয়।