যুদ্ধের আগে আরেক যুদ্ধ, খুলবে কার ভাগ্য?

কওমি কণ্ঠ রিপোর্টার :

সিলেট-৩। দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় এই আসন। সিলেটের বাকি ৫ আসনের চাইতে এটিতে ভোটার সংখ্যা বেশি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর এক মাসও বাকি নেই। সময় বেশ ঘনিয়ে আসলেও ভোটারসমৃদ্ধ সিলেট-৩ আসনে ‘১০ দলীয় জোট’র প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। যদিও বিভিন্ন সূত্র বলছে- এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা লোকমান আহমদ ‘কনফার্ম’। তবে ‘জোট’র পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাতে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে প্রেস ব্রিফিং করে জোটের ১০টি দলের আসন বণ্টনের তালিকা প্রকাশ করেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তবে আসনভিত্তিক দল বা প্রার্থীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

সমঝোতা অনুযায়ী- জামায়াতে ইসলামী ১৭৯ আসনে প্রার্থী দিয়ে লড়াই করবে। আর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) লড়াই করবে ৩০টি আসনে। এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০, খেলাফত মজলিস ১০, এলডিপি ৭, এবি পার্টি ৩, নেজামে ইসলাম ২ ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২ আসনে প্রার্থী দিয়ে লড়াই করবে।

আসনভিত্তিক প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ না করা হলেও বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ- সিলেট জেলার ৬টির মধ্যে ৪ আসনে প্রার্থী দেবে জামায়াত। সেগুলো হলো- সিলেট-১ (সিলেট সদর উপজেলা ও সিলেট সিটি করপোরেশন), এখানে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবীবুর রহমান। সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা), এখানে মাওলানা লোকমান আহমদ জামায়াতের প্রার্থী। সিলেট-৪ (জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা), এখানে জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আহমদ। সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা), এখানে জামায়াতের প্রার্থী মো. সেলিম উদ্দিন। 

বাকি দুটি আসন- সিলেট-২ ও সিলেট-৪ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জোটের শরিক দল খেলাফত মজলিসকে। সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলা) আসনে দলের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী এবং সিলেট-৫ (কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলা) আসনে জেলার উপদেষ্টা মুফতি আবুল হাসান ‘জোট’র প্রার্থী। 

তবে সিলেট-৩ আসন নিয়ে রয়ে গেছে অমীমাংসা। এ আসনে ১০ দলের নেতৃত্ব দেওয়া জামায়াতের প্রার্থী ছাড়াও শরিক দল খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুই প্রার্থী ‘হেভিওয়েট’। এছাড়া এনসিপি’র তরুণ প্রার্থীও নজর কেড়েছেন অনেকের।

খেলাফত মজলিস গত বছরের অক্টোবরে এককভাবে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার সময় সিলেট-৩ এ জেলার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা দেলোয়ার হোসাইনকে প্রার্থী করে। মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সিলেটের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তিনি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সিলেট-৩ আসনজুড়ে চষে বেড়াচ্ছেন। অংশগ্রহণ করেছেন দক্ষিণ উপজেলা পরিষদ এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। দিনের পর দিন নিজের রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিগতভাবেও আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জের মানুষের পাশে। বিশেষ করে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাবসেবামূলক প্রতিষ্ঠান করোনাকালে মরণঘাতিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া লাশ গোছল এবং দাফন-কাফন করিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন মানুষের। প্রকৃত অর্থে একজন জনদরদি একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সিলেট-৩ আসনজুড়ে মাওলানা দেলোয়ার হোসাইনের সুখ্যাতি রয়েছে। দলীয় নেতাকর্মী ও তাঁর সমর্থকরা সিলেট-৩ আসনে তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে চাচ্ছেন। 

অপরদিকে, মাওলানা মামুনুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে সদ্য যোগ দেওয়া হাফিজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুও জনপ্রিয় ব্যক্তি। তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত শায়খুল হাদিস আল্লামা নুর উদ্দিন আহমদ রাহ. গরহপুরি-এর একমাত্র ছেলে, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসুল আরাবিয়াহ-এর সহ-সভাপতি ও ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া গহরপুর-এর মুহতামিম।

গত ৭ ডিসেম্বর গহরপুর মাদরাসায় অনুষ্ঠিত উলামা-সুধী সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যকালে তিনি উপস্থিত জনতা ও সিলেট-৩ আসনের জনসাধারণের কাছে মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুকে সিলেট-৩ আসনে তাঁর দলের প্রার্থী ঘোষণা করে দোয়া এবং ভোট চান।

এ ঘোষণার পর থেকেই আসনটির আলেম-সমাজের মাঝে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে এবং উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়। কিন্তু সদ্য যোগ দেওয়া মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুর দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ‘১১ দলীয় জোটে’ (বর্তমানে ১০ দল) যুক্ত হয়ে যাওয়া এবং সিলেট-৩ আসনকে ঝুলিয়ে রাখা নিয়ে এবার হতাশা তৈরি হয়েছে তাদের মাঝে।

অনেকের বক্তব্য- কওমি ঘরানার ভোট টানার পাশাপাশি বাবার (আল্লামা গহরপুরি) তুমুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবেন হাফিজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু। কিন্তু আসন বণ্টন জটিলতায় আল্লামা গহরপুরির ছেলের প্রতি রীতিমতো অসম্মান দেখানো হচ্ছে। 

সব হিসাব-নিকাশ পেছনে ফেলে শীঘ্রই গহরপুরিপুত্রকে এ আসনে প্রার্থী ঘোষণার জন্য ‘১০ দলীয় জোট’র নীতিনির্ধারকদের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন মুসলেহ উদ্দিন রাজুর কর্মী-সমর্থকরা।

সার্বিক বিষয়ে হাফিজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু আজ শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কওমি কণ্ঠকে বলেন- এ আসন নিয়ে জামায়াতসহ অন্যান্য শরিক দলের সঙ্গে আলোচনা করছেন আমাদের আমির আল্লামা মামুনুল হক। এ আসন যদি একান্ত আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে না দেওয়া হয় তবে উন্মুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আমার ব্যক্তিগত মতামত এখনো দিতে চাচ্ছি না, দু-একদিনের মধ্যেই আশা করি ‘ঐক্যের’ পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- আসনের ৩ উপজেলার অনেক গণ্যমাণ্য ও সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তি যোগাযোগ করছেন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার আবদার করছেন। এ আসনের ভোটারদের মাঝেও অনেক ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়।

এদিকে, এনসিপি’র কেন্দ্রীয় আহব্বায়ক কমিটির সদস্য ও সিলেট-৩ আসনের তরুণ প্রার্থী ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদও অনেকের- বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। প্রার্থী ঘোষণার আগে থেকেই তিনি বিভিন্নভাবে ভোটাদের কাছে পৌঁছাতে চাচ্ছেন এবং নিজের পরিচিতি বাড়িয়েছেন। প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে আরও বাড়িয়েছেন প্রচার-প্রচারণা। কিন্তু আসন-সমঝোতা জটিলতায় তাঁর নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও হতাশ।

ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ শুক্রবার সকালে কওমি কণ্ঠকে মুঠোফোনে জানান- সিলেট-১ অথবা সিলেট-৩; যে কোনো একটি চাচ্ছি আমরা। বিষয়টি অখনো অমীমাংসিত। জামায়াতসহ অন্যান্য শরিক দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে।