চা সেক্টরে ‘গুপ্ত ফ্যাসিস্টরা’ পরিস্থিতি অশান্ত করতে চাচ্ছে!

কওমি কণ্ঠ ডেস্ক :

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখায় চা বোর্ড নিয়ন্ত্রিত নিউ সমনবাগ, পাথারিয়া, মোকাম চা বাগানের শ্রমিক ও অডিট টিমের মধ্যকার মীমাংসিত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিন বাগানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৯৪ জনের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দিয়েছে চা বোর্ড। বোর্ডের এমন নির্দেশে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাগানসহ গোটা উপজেলায়।

জানা গেছে, এই নির্দেশনার খবর পেয়ে এখনই কারও বিরুদ্ধে মামলা না করতে বোর্ডকে তাৎক্ষণিক বার্তা পাঠিয়েছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন মিঠু। 

এদিকে চা বোর্ডের এমন নির্দেশনাকে অমানবিক ও অন্যায় অভিহিত করে ক্ষোভ জানিয়েছেন বাগানের শ্রমিক-কর্মচারীরা।

গতকাল মঙ্গলবার ভুক্তভোগী চা শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা বাগান ব্যবস্থাপকের কার্যালয় ঘেরাও করে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন ও নিন্দা জানান।

এদিকে নবনির্বাচিত স্থানীয় সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু শপথ গ্রহণ শেষে নির্বাচনী এলাকায় ফিরেই বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন।

তিনি জানান, তিনি এলাকায় পৌঁছানো পর্যন্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা যেন না করা হয়– প্রতিনিধির মাধ্যমে বাগান ব্যবস্থাপকের কাছে সেই বার্তা পাঠিয়েছেন।

জানা গেছে, নিউ সমনবাগ, মোকাম সেকশন ও পাথারিয়া চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বন্ধ এবং অডিট টিমের সদস্যদের আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে ১৩ জানুয়ারি প্রায় দেড় হাজার বিক্ষুব্ধ চা শ্রমিক বাগান ম্যানেজার, বাগান কর্মচারী ও অডিট টিমের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। এতে বাগানে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়।

খবর পেয়ে ইউএনও গালিব চৌধুরী, থানার ওসি মনিরুজ্জামান খান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ইমরান আহমদ, অডিট টিমের প্রধান সাইফুল ইসলামসহ অন্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন,  নারী শ্রমিকদের নিয়ে অডিট টিমের সদস্যদের আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে তারা দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

এক পর্যায়ে সংশ্লিষ্টরা শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ ও অন্যান্য দাবি-দাওয়া পূরণে চা বোর্ডকে যথাযথভাবে অবহিত করবেন বলে জানালে বিক্ষুব্ধ চা শ্রমিকরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন। পরে ইউএনও, ওসি, ইউপি চেয়ারম্যান ও শ্রমিক নেতারা বিষয়টির মীমাংসা করেন।

এ ঘটনার এক মাস তিন দিন পর ১৬ ফেব্রুয়ারি চা বোর্ডের সচিব মো. মমিনুর রশীদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে ১৩ জানুয়ারির ঘটনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ এনে বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক রাজনারায়ণ পাল, করণিক রামসুজন ভর, স্টোর ক্লার্ক শ্রীকুমার, হেড ক্লার্ক এসএম শাহিন, টিলা ক্লার্ক দীপক কুর্মি, কামাল হোসেন, সঞ্জিত রবিদাস, সন্দীপ সিংহ, টিলা স্টাফ জিতেন, নিখিল সাঁওতাল, অজিত রবিদাসসহ ৯৪ জন কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে থানায় ফৌজদারি মামলা দায়েরের জন্য নিউ সমনবাগ চা বাগানের ব্যবস্থাপক এমদাদুর রহমানকে নির্দেশ দেওয়া দেন। এ খবর প্রকাশ পেতেই ফুঁসে ওঠে প্রতিটি চা বাগান ও সেকশনের শ্রমিকরা। মঙ্গলবার সকালেই তারা ব্যবস্থাপকের কার্যালয় ঘেরাও করে।

শ্রমিক নেতারা জানান, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের ব্যবস্থা না নিয়ে চা বোর্ড তাদের চাকরিচ্যুতির ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। ওই দিন অডিটের লোকজন নারী শ্রমিকদের  খারাপ মন্তব্য করায় প্রতিবাদ জানান তারা। অভিযুক্তরা অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এক মাস পর এখন সেই ইস্যুতে ফৌজদারি মামলার নির্দেশ দেওয়া মানে শ্রমিকদের হুমকি দেওয়া। এই অন্যায় আচরণ সহ্য করা হবে না।

এ বিষয়ে নিউ সমনবাগ চা বাগানের ব্যবস্থাপক এমদাদুর রহমান জানান, টি বোর্ড থেকে ৯৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকের একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে। ১৩ জানুয়ারির ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে (মঙ্গলবার) থানায় ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু প্রতিনিধির মাধ্যমে তিনি এলাকায় ফেরার পূর্ব পর্যন্ত মামলা দায়ের না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠুর প্রতিনিধি উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ইকবাল হোসেন ও দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, ১৩ জানুয়ারির ঘটনাটি ইউএনও ও থানার ওসি মীমাংসা করেছেন। তখন অনেকের সঙ্গে তারা উপস্থিত ছিলেন। ওই ঘটনায় নিরীহ শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার মতো কিছু ঘটেনি।

এদিকে শ্রমিকদের এমন অবস্থায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন মিঠুর ভূমিকা এলাকাজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, শপথ অনুষ্ঠানের ব্যস্ততার অজুহাত না দিয়ে তিনি নিজে উপস্থিত হয়ে সমস্যা সমাধান করবেন বলে জানিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে বোর্ডকে মামলা না করতে নিজের বিশেষ প্রতিনিধির মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছেন। শ্রমিকরা তাঁর এই দায়িত্বশীল ভূমিকার জন্য খুশি। মূলত বিএনপির সরকার প্রতিষ্ঠার পরপরই চা সেক্টরে থাকা গুপ্ত ফ্যাসিস্টরা শ্রমিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে পরিস্থিতি অশান্ত করতে পাঁয়তারা করছে।