চার লেনের চক্করে এখন ‘মৃত্যুফাঁদ’

কওমি কণ্ঠ ডেস্ক :

সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী যানবাহন চলে রাস্তার বাঁ দিক দিয়ে। কিন্তু সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে এ আইন যেন অচল। এখানে সিলেটমুখী যানবাহনগুলো রাস্তার বাঁ পাশ খালি রেখে বিপজ্জনকভাবে ডান দিক দিয়ে চলে। ফলে বিপরীত দিকে আসা যানবাহনকে শেষ মুহূর্তে সরে জায়গা দিতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।


অতিরিক্ত মাল বোঝাই করে ট্রাক চলাচলের কারণে সড়ক  ভেঙেচুরে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। 
এদিকে, চার লেনে উন্নীতের ফাঁদে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারবিহীন থাকায় তা মৃত্যুফাঁদে রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় মহাসড়কটি এমন বেহাল। 

সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক ঘুরে দেখা গেছে, ৫৬ দশমিক ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কটি সিলেটের কেন্দ্রের সঙ্গে ভারত সীমান্তবর্তী তামাবিল এলাকাকে যুক্ত করেছে।


ঢাকা-সিলেট জাতীয় মহাসড়ক-২ (এন টু)-এর ২২৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার থেকে ২৮৪ দশমিক ৪৫৭ কিলোমিটার পর্যন্ত এ মহাসড়কের বিস্তৃতি।
সরেজমিন ঘুরে আরো দেখা যায়, সিলেট সদর উপজেলা পার হলে জৈন্তিয়া গেইট থেকেই মহাসড়কের দূরাবস্থা শুরু। তামাবিল পর্যন্ত মহাসড়কের বেশিরভাগ অংশই ভাঙাচোরা। বিশেষ করে পাখিটিকি, দরবস্ত (শেলটেকের সামনে) বাঁধ এলাকা, দরবস্ত বাজার, সারিঘাট বাজার, জৈন্তা ডিগ্রি কলেজের সামনের সড়ক, সারীঘাট উত্তর ও দক্ষিণ পাড়, হাইওয়ে পুলিশ সম্মুখ, কদমখাল, রাংপানি ও ৪ নম্বর আসামপাড়া, ৪ নম্বর বাংলাবাজারের বাঘের সড়ক এলাকায় সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে বড় বড় গর্ত হয়ে বিপজ্জনক হয়ে আছে।


২০২৩ সালের ৮ জুলাই জৈন্তাপুরে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২-এর সামনে শ্রীখেল নামক অংশে একইভাবে ভাঙা অংশ এড়াতে ডান দিকে চলে আসা বাসের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে পাঁচজন নিহত হন। আহত হন অন্তত ১৫ জন। এরকম দুর্ঘটনা নিয়মিত এখানে। এতে প্রাণহানিও হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ছয় সাত বছর ধরে সড়কটি ধীরে ধীরে ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবশেষ আড়াই বছর আগে নামকাওয়াস্তে সংস্কার হয়েছিল। কিন্তু বেশিদিন টেকেনি। দিন দিন অবস্থা খারাপ হলেও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই সড়ক ও জনপথ বিভাগের। কেবল বেশি খারাপ হলে ইট বিছিয়ে ভাঙা অংশে প্রলেপ দিয়ে জোড়াতালিতে চলছে কাজ।

স্থানীয় বাসিন্দা ও জাফলং ইউনিয়নের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক নজমুল ইসলাম বলেন, এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক বেহাল দীর্ঘদিন ধরে। এটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।’

এ বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলার ১ নম্বর নিজপাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইন্তাজ আলী বলেন, ‘প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটে। বড় দুর্ঘটনা হলে জানাজানি হয়। কিন্তু প্রতিদিন মোটরসাইকেল হোক, লেগুনা হোক আর টমটম হোক দুর্ঘটনা ঘটেই। এ বিষয়ে আমরা সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি, তিনি বলেন-আমরা এটি ফোর লেনকে সমজিয়ে দিয়েছি। এখন আমাদের কাজ করার ক্ষমতা নেই। ফোর লেন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, আমরা বিল পাই না। কাজ করব কিভাবে।’ 

এই মহাসড়ক ফোর লেন কর্তৃপক্ষ বুঝে নেওয়ার পর গত দুই-তিন বছরে আর কোনো কাজ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মহাসড়কটি এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অবস্থা সিরিয়াস খারাপ।’

সিলেটের উপজেলার ৪ নম্বর দরবস্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাহারুল আলম বাহার বলেন, ‘রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, চলাচলের অনুপযুক্ত। বিভিন্ন জায়গায় খানাখন্দে ভরা।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘দরবস্ত বাজারসংলগ্ন সেতুর অ্যাপ্রোচ বিপজ্জনকভাবে ফাটল ধরেছে। যেকোনো সময় সড়ক থেকে সেতু বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে একাধিক উপজেলা পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বিচ্ছিন্ন হবে।’

ইউপি চেয়ারম্যানের অভিযোগ, ‘সড়ক ও জনপথ বিভাগকে বললে তারা মাঝে মাঝে গিয়ে ইট বিছিয়ে আসে। ঝড় দিলে সেটি উঠে যায়। তিন বছর ধরে এই অবস্থা। তাদের বললে বলে ফোর লেনের জন্য টেন্ডার হয়ে গেছে, কন্ট্রাক্ট সাইন হয়ে গেছে, ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে। আর কম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বলে, এটা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের না।’

চার লেন প্রকল্প যেন গলার ফাঁস: নথি ঘেটে দেখা গেছে, মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে ‘সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক পৃথক এসএমভিটি লেনসহ ৪-লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প’ শিরোনামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়, যার মেয়াদকাল ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। এর আওতায় চার ধাপে প্যাকেজ-১ এ সিলেট থেকে খাদিম পর্যন্ত ৯ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, প্যাকেজ ২-এ খাদিম থেকে বাগের বাজার পর্যন্ত ২১ দশমিক ৭ কিলোমিটার, ও প্যাকেজ ৩-এ বাগের বাজার হতে তামাবিল পর্যন্ত ২৪ দশমিক ৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করার কথা। পাশাপাশি প্যাকেজ ৪-এ মডিফাইড এসফল্ট প্লান্ট এবং ইমালসন প্লান্ট স্থাপন করার কথা।

দক্ষিণ সুরমার পীর হাবিবুর রহমান চত্বর থেকে তামাবিল পর্যন্ত মোট ৫৬ দশমিক ১৬ কিলোমিটার মহাসড়ককে পৃথক এসএমভিটি লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণের উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়া জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈদেশিক ও দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানো, নিরাপদ, টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ করাসহ বিভিন্ন কারণ। কিন্তু প্রকল্পের সময়সীমা শেষ হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি। এই প্রকল্প ঝুলে থাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ তাতে আর বড় ধরণের কোনো সংস্কার কাজ করতে পারছে না। 

সম্প্রতি মন্ত্রণালয়, সওজসহ বেশ কয়েকটি পক্ষের সমন্বয়ে একটি দল প্রকল্প এলাকা ঘুরে গেলেও কী সুপারিশ করেছে তা জানা যায়নি।

এ বিষয়ে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক পৃথক এসএমভিটি লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের পরিচালক আবু সাঈদ মো. নাজমুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

রাস্তার দূরাবস্থার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সড়ক জোন, সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘ওভার লোডেড ট্রাকগুলোর কারণে মূলত সিলেটমুখি রাস্তার বাঁ পাশের এমন দশা হয়েছে। কেউ আইন মানে না। ডান দিকে চলে আসে, সেটা আমি জানি।’ তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে সাবেক মেয়রের (আরিফুল হক চৌধুরী) সঙ্গে কথা হয়েছে, আমাদের সওজের প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে আমাদের সচিবের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমরা কিছু টাকা চেয়েছি। পাওয়া গেলে কিছু মহাসড়কে কার্পেটিংসহ সংস্কার করে দিতে পারব।’ সাড়া মিলেছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সাড়া মিলেছে। 

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আরো বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হয়েছে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। প্রক্রিয়া শেষ করে সঠিক নিয়মে কাজ করতে একটু সময় লাগবে।’ মাসখানেকের মধ্যে কাজ শুরু করতে পারবেন জানিয়ে বলেন, ‘এখন বর্ষা নেই তাই খুব সমস্যা হবে না। যেখানে বড় যে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত সেখানে কেটেকুটে সমান করে চলার উপযুক্ত করব আমরা। তবে কার্পেটিং একটু পরে করা হবে। দরপত্র হলে পরে কাজ হবে।’

সম্প্রতি একটি প্রতিনিধি দলের পরিদর্শনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১০ থেকে ১২ দিন আগে পরিকল্পনা কমিটি, আইএমইডি (বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ), বিআরটিএ, মন্ত্রণালয়, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে থেকে একটি কমিটি এসে পরিদর্শন করে গেছে। প্রকল্পের সময় এক বছর বাড়ানোর সুপারিশ হয়তো তারা করবে। এখনো করেনি। যদিও তারা কি সুপারিশ করবেন তা আমাদের জানাননি এখনো। কাগজপত্র হাতে এলে বোঝা যাবে।’


(মূল রিপোর্ট : কালের কণ্ঠ)