সিলেটে কিশোর গ্যাং নির্মূলে ‘স্ট্রেট অ্যাকশনে’ পুলিশ

কওমি কণ্ঠ রিপোর্টার :

সিলেট মহানগরে পাড়া-মল্লায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। চুরি, ছিনতাই, খুনসহ সব ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়ে এদের দ্বারা। কিছুদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনী এদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা বললেও নেওয়া হয় না কার্যকর পদক্ষেপ। 

কিশোর গ্যাংগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে গত ১৫ দিনে সিলেটে খুন হয়েছে তাদের দুই সদস্য।

সম্প্রতি মহানগরের বালুচরে টিলার উপর একটি কিশোর গ্রুপের কতিপয় সদস্যকে রাম দা-সহ বিভিন্ন ভয়ংকর অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। 

গত বৃহস্পতিবার রাতে বাদামবাগিচা এলাকায় প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং-এর ছুরিকাঘাতে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোর খুন হয়েছে।

এছাড়া গতকাল শুক্রবার বিকেলেও নয়াসড়ক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে একজন গুরুতর আহত হয়েছে।

জানা গেছে- মহানগরের টিলাগড় পয়েন্ট, বালুচর, শাহী ঈদগাহ এলাকা, ইলেকট্রিক সাপ্লাই, আম্বরখানা, সুবিদবাজার, মদিনা মার্কেট, তেমুখী পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, নবাবরোড, মাছুদিঘীরপার, লালাদিঘীর, কুয়ারপার, শেখঘাট, শিবগঞ্জ, উপশহর, ওসমানী মেডিকেল কলেজ এলাকাসহ প্রতিটি পাড়া মহল্লায় কিশোর গ্যাং তৈরি হয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা বেপরোয়া। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটানোর পাশাপাশি আধিপত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যেও করে মারামারি। এতে ঘটে প্রাণহানির ঘটনা। 

অভিযোগ রয়েছে- এ চক্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকার লোকজন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর কাছে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না । অভিযোগ পেয়ে পুলিশ কিছুদিন অভিযান পরিচালনা করলেও ফের তারা সক্রিয় হয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়। 

মহানগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন- ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মহানগরের প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় একাধিক গ্রুপ ও উপগ্রুপ তৈরি হয়েছে। পাড়া-মহল্লায় বাসা-বাড়ির সামনে এদেরকে রীতিমতো চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আড্ডা দিতে দেখা যায়। পাবলিক প্লেসে ধূমপান আইনত নিষিদ্ধ থাকলেও এসব গ্যাংয়ের কিশোরদের প্রকাশ্যে মতো সিগারেট সেবন করতে দেখা যায়। 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের আগে ছাত্রলীগের কর্মী পরিচয় দিতো এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। তবে এখন ছাত্রদল কর্মী পরিচয় দেয় নিজেদের।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের শেল্টার দেন স্থানীয় কতিপয় ‘বড় ভাইয়েররা’- রয়েছে এমন অভিযোগ।

তাদের নিজেদের দ্বন্দ্বে বৃহস্পতিবার রাতে মহানগরের বাদামবাগিচায় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয় স্কুলছাত্র শাহ মাহমুদ হাসান তপু (১৫)। পরদিন (শুক্রবার) সকালে সে হাসপাতালে মারা যায়। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে নিহত তপুর মা সুফিয়া বেগম বাদী হয়ে সিলেট এয়ারপোর্ট থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

মামলায় প্রধান অভিযুক্ত মো. জাহিদ হাসানসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞতনামা আরও ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলায় নাম উল্লেখ করা তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। তারা হলো- মো. জাহিদ হাসান, মো. অনিক মিয়া ও মো. জুনেদ আহমদ। বাকী আসামিদরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

জানা যায়, শাহ মাহমুদ হাসান তপুকে বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ছুরিকাঘাত করা হয়। শুক্রবার সকালে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে।

তপু এয়ারপোর্ট থানাধীন ইলাশকান্দি বাদামবাগিচার উদয়ন ৪০/২ আবাসিক এলাকার শাহ এনামুল হকের ছেলে ও খাসদবির উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। 

জানা গেছে, অপু ও জাহিদ পরষ্পরের বন্ধু। এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িত ছিলো তারা। কিশোর গ্যাং নিয়ে বিরোধের জেরে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে তপুকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাত করে জাহিদসহ কয়েকজন। 

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়- বৃহস্পতিবার রাতে তপু ও জাহিদসহ দুপক্ষের অনুসারীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে জাহিদকে তপু মারধর করে। পরে তপুকে ছুরিকাঘাত করে জাহিদ।

তপুর এক বন্ধু জানায়, রাতে ঘটনার সময় তপুরা ছিলো তিনজন আর জাহিদরা ছিলো ১৫/২০জন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তপু মাটিতে পড়ে যায়। এসময় তার পেটে ছুরিকাঘাত করে জাহিদ।

শুক্রবার সন্ধ্যায় জানাযা শেষে লাশের দাফন সম্পন্ন হয়।

এই ঘটনার রেশ না কাটার আগেই শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে মহানগরের হাওয়াপাড়া গলির মুখে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের কিশোররা দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে একে অপরের উপর হামলা চালায়। এতে একজন কিশোর গুরুতর আহত হয়। আহত কিশোরকে তার সঙ্গে থাকা বন্ধুরা দ্রুত সিএনজি অটোরিক্সায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

কাজিটুলা ও জেলরোড এলাকার কিশোরদের মধ্যে স্কুলকেন্দ্রীক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এর আগে ১২ নভেম্বর মহানগরের বালুচরে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ফাহিম আহমদ (১৫) নামে এক কিশোর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

ফাহিম দোয়ারাবাজার উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের হারুন রশিদের ছেলে। পরিবারের সঙ্গে সে বালুচর ছাড়ারপাড় এলাকায় থাকতো। 

ফাহিমের ভাই মামুন তার ভাইকে মারার জন্য বুলেট মামুন গ্রুপের লোকজনকে দায়ী করেন।

এ ঘটনায় ফাহিমের পিতা অভিযোগ দায়ের করলে শাহপরান থানাপুলিশ সবুজ আহমদ রেহান নামে একজনকে আটক করে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মহানগরের বালুচর এলাকার বিভিন্ন টিলায় কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানা। তারা সেখানে প্রায়ই অস্ত্রের মহড়া দেয়। এরকম একটি ভিডিও সম্প্রতি ভার্চুয়াল মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এতে উদ্বেগে আছেন এলাকার বাসিন্দারা।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম কওমি কণ্ঠকে বলেন- ‘কিশোর গ্যাং আর গ্রুপ যাই হোক, এবার আর সিলেট এমন কিছু থাকবে না। পুলিশ আজ থেকে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। আর যারা এদের শেল্টার দেন তাদেরও আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’

র‍‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍‍্যাব)-৯ এর মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ কওমি কণ্ঠকে বলেন- ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অবিরাম কাজ করছি আমরা। সংবাদমাধম্য সূত্রে জানতে পারছি বিভিন্ন কিশোর গ্রুপের অপতৎপরতার কথা। আমরা গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করছি এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছি।’