কোন ভরসায় বিদ্রোহী হচ্ছেন জমিয়তের ফখরুল?

কওমি কণ্ঠ রিপোর্টার :

সিলেট-৬। শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক এবং প্রবাসী অধ্যুষিত দুই উপজেলা গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। সব ঠিক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল কাঙ্খিত ‘দিন’র ভোট।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সিলেট-৬ আসনে দেখা যাচ্ছে ভোটের নানা সমীকরণ। বিএনপি তাদের একক প্রার্থী ঘোষণা করে গত ৩ নভেম্বর। কিন্তু জামায়াত নেতৃত্বাধীন ‘৮ দলীয় জোট’ এ আসনে এখনো তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি। এরই মাঝে গত ২৪ ডিসেম্বর বিএনপি তাদের শরিক দল জমিয়তে ইসলামকে সারা দেশে ৪টি আসন ছাড় দিয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সিলেট-৫। তবে জমিয়তের দাবি ছিলো সিলেট-৪ এবং সিলেট-৬-ও। সে দাবি পূরণ করেনি বিএনপি। ফলে খানিকটা মনোক্ষুণ্ণ হয় জমিয়ত। সেই চাপা কষ্ট বুকে রেখেই সিলেট-৫ ছাড়া বাকি আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে আহ্বান জানায় জমিয়ত। কিন্তু বেঁকে বসেছেন সিলেট-৬ আসনে জমিয়ত বা ‘বিএনপি জোট’র প্রার্থিতা প্রত্যাশী হাফিজ ফখরুল ইসলাম। তাঁর পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে- স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে যাচ্ছেন তিনি।

শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) এ বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং করে ঘোষণা দেওয়া হয়- সিলেট-৬ আসনে নির্বাচন করবেন জমিয়ত নেতা হাফিজ ফখরুল ইসলাম।

এই প্রেস ব্রিফিং থেকে জমিয়তকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে বলা হয়- এর মধ্যে দলকে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন ফখরুল ইসলাম।

এর আগে গোলাপগঞ্জে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে হাফিজ ফখরুল ইসলামকে সিলেট-৬ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব। এরপর থেকে গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারে ব্যাপক কার্যক্রম চালান তরুণ এই নেতা। বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশ কিছু উন্নয়ন-প্রকল্প সম্পন্ন করেন তিনি। সাধারণ ভোটারদের মন জয়ে নিজের সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করেন ফখরুল ইসলাম। তাঁর এই পরিচিতি ও সুখ্যাতি শঙ্কা জাগায় জামায়াতের প্রার্থী সেলিম উদ্দিনের মনে। তিনি হাফিজ ফখরুলকে কটাক্ষ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্যও রাখেন। এতে ফখরুলের প্রতি ভোটারদের আগ্রহ আরও বাড়ে। কিন্তু তার দল জমিয়ত সিলেট-৬ আসন বিএনপিকে ছেড়ে দেওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন ফখরুলের কর্মী-সমর্থকরা। একপর্যায়ে তিনি ঘোষণা দেন ‘বিদ্রোহী’ হওয়ার। 

ফখরুলের দাবি- তাঁর এই বিদ্রোহযাত্রায় সঙ্গে রয়েছেন গোলাপঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের জমিয়তের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তবে সেখানের জমিয়তের একাংশ মনে করেন- দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। ফখরুল ইসলাম যেহেতু বয়সে তরুণ, তাই আগামীতে তার আরও সম্ভাবনা রয়েছে। শুরুতেই সমালোচিত হয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করলে শেষ পর্যন্ত সম্মানজনক ভোট না পেলে বিষয়টি হবে লজ্জার। বিষয়টি আগামীতে নেতিবাচক প্রভাবও ফেলবে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে। তাই এই নির্বাচনে ফখরুলকে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াই সমুচিত বলে মনে করেন জমিয়তের এই অংশ।

অন্যদিকে গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারের তৃণমূল ভোটারদের বক্তব্য- বিএনপি ও জমিয়ত যেহেতু এক মঞ্চে, তাই সমঝোতার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত ফখরুল ইসলামকে মেনে নেওয়াই সব দিক থেকে ভালো হবে।

গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারের সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন- ভোটের হিসাবে নির্বাচনে তৃতীয় হতে পারেন হাফিজ ফখরুল। জয়ের দৌঁড়ে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। আর দ্বিতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে জামায়াতের প্রার্থী সেলিম উদ্দিনের।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে হাফিজ ফখরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন- মানুষের যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি, সেই ঋণ আমি শোধ করতে চাই। গত এক বছর ধরে আমি মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে কাজ করছি। জোটের সিদ্ধান্তে আসন না পেলেও আমি পিছু হটবো না। মানুষের দাবির মুখে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো, ইনশা আল্লাহ।

এদিকে, জমিয়তের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে কেউ বিদ্রোহী হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব ও সিলেট মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আবদুল মালিক চৌধুরী। তিনি কওমি কণ্ঠকে মুঠোফোনে বলেন- যে দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, সে বিদ্রোহী প্রার্থী হতে পারে না। দলের হাই-কমান্ড যেটি সঠিক মনে করেছে সেটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএনপির প্রার্থীর আসনগুলোতে জমিয়তের নেতাকর্মীরা তাদের সমর্থন করবেন, এটাই দলীয় নির্দেশনা। কেউ যদি দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হন, তাহলে জমিয়ত তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেবে।