কওমি কণ্ঠ রিপোর্টার :
এমনিতেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসন ছিলো সিলেট-৩। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে করে সেটি এখন হয়ে উঠে আরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সর্বোপরি অনেক নাটকীয়তার পর গঠিত ‘১০ দলীয় জোট’র ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ হয়ে দাঁড়িয়েছে আসনটি।
৪ লাখ ২৯ হাজার ভোটারসমৃদ্ধ সিলেট-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হচ্ছেন দলটির যুক্তরাজ্য শাখার সদ্যসাবেক সভাপতি এম এ মালিক। ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এ আসনে খবর ছিলো- তাঁর নিকটত প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ‘১০ দলীয় জোট’র প্রার্থী, ওই দলের নেতা মাওলানা লোকমান আহমদ। কিন্তু ১৯ জানুয়ারি বিকালে ১০ দলের সমন্বয়বৈঠকে জামায়ত এ আসন ছেড়ে দেয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে। ফলে এ আসনে ‘১০ দলীয় জোট’র প্রার্থী নির্ধারিত হন বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসুল আরাবিয়াহ-এর সহ-সভাপতি ও ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া গহরপুর-এর মুহতামিম হাফিজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু।
প্রথমে বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি জামায়াতের প্রার্থী লোকমান আহমদের কর্মী-সমর্থকরা। তারা ২০ জানুয়ারি এই নেতার বাড়িতে জড়ো হয়ে তাকে প্রায় পুরো দিন তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরে সন্ধ্যার আগমুহুর্তে দলের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে লোকমান আহমদকে মুক্ত করা হয় এবং তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।
ইতোমধ্যে অনেক স্থানে মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুর পক্ষে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মাঠে কাজও শুরু করে দিয়েছেন। কারণ- আসনটি এখন ১০ দলের ‘প্রেস্টিজ ইস্যুতে’ পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার (১৭ জানুয়ারি) বিকালে অনুষ্ঠিতব্য সিলেট-৩ আসনের বালাগঞ্জ উপজেলায় নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। বিকাল ৪টায় তিনি হেলিকপ্টারযোগে বালাগঞ্জ ডিএন উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এসে পৌঁছবেন। এ জনসভায় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদেরও বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে। এ তথ্য কওমি কণ্ঠকে সোমবার রাতে নিশ্চিত করেছেন এমপি প্রার্থী হাফিজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু।
‘১০ দলীয় জোট’র প্রার্থী মুসলেহ উদ্দিনের প্রতীক ‘রিকশা’। গত ৬ ডিসেম্বর দুপুরে সিলেটের বালাগঞ্জে অনুষ্ঠিত উলামা-সুধী সমাবেশে তাঁকে প্রার্থী ঘোষণা করেন দলটির আমির মাওলানা মামুনুল হক। ওই দিনের সমাবেশে তিনি উপস্থিত জনতা ও সিলেট-৩ আসনের জনসাধারণের কাছে মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুর জন্য দোয়া এবং ভোট চান।
এ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে হাফিজ মাওলানা মুসলেহ রাজুও নির্বাচনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
গহরপুরিপুত্র মুসলেহ উদ্দিন সিলেট-৩ আসনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণার শুরুতেই ভোটারদের মাঝে শুরু হয় নতুন করে হিসাব-নিকাশ। আসনটির ৩ উপজেলার সাধারণ ভোটারদের বক্তব্য- আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূল লড়াই হবে এম এ মালিক ও হাফিজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুর মধ্যে।
অনেকেই বলছেন- কওমি ঘরানার ভোট টানার পাশাপাশি বাবার তুমুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন হাফিজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু।
উল্লেখ্য, সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার শিওরখাল মোল্লাপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯২৪ সালে জন্মগ্রহণকারী শায়খুল হাদিস আল্লামা নূর উদ্দীন আহমদ গহরপুরি রাহ. ছিলেন বরেণ্য বুজুর্গ। দেশ-বিদেশে ‘মুহাদ্দিস সাহেব’ ও ‘গহরপুরী হুজুর’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। প্রখ্যাত বুজুর্গ, শাইখুল আরব ওয়াল আজম হোসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর একান্ত খাদেম ও শাগরেদ ছিলেন। সিলেটের জামিয়া গহরপুরসহ অসংখ্য মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আল্লামা নূর উদ্দীন। ইলমি ও আধ্যাত্মিকতায় পুরো উপমহাদেশে তাঁর অবস্থান ছিল অনন্য উচ্চতায়।
১৯৯৬ সাল থেকে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত প্রায় নয় বছর আল্লামা নূর উদ্দীন আহমদ গহরপুরি রাহ. কওমি মাদরাসাভিত্তিক সর্ববৃহৎ শিক্ষাবোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া, বাংলাদেশ’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি পাকিস্তান আমলে রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা হিসেবে ১৯৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে খেজুরগাছ প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। এর আগে ১৯৬৮ সালে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে আয়োজিত ‘ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব পাকিস্তান’-এর গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্সে প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে যোগদান করেন।
২০০৫ সালের ৬ এপ্রিল আল্লামা নূর উদ্দীন আহমদ গহরপুরি রাহ.-এর ইন্তেকাল হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হাফিজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু শায়খুল হাদিস আল্লামা নুর উদ্দিন রাহ. গরহপুরি-এর একমাত্র ছেলে।