জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে বিয়ানীবাজারে ইটভাটার জমি জবরদখলের অভিযোগ 

কওমি কণ্ঠ রিপোর্টার :

সিলেটের বিয়ানীবাজারে একটি ইটভাটার বেশ কিছু জায়গা জবরদখল করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে ইটভাটা কর্তৃপক্ষ আদালতে মামলাও করেছেন। তবে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ- আদালতে মামলা ও বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেও প্রতিকার মিলছে না। জবরদখলকারীরা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে তারা বেপরোয়া হয়ে এমন অন্যায় কাজ করছেন।

তবে অভিুুক্তদের পাল্টা অভিযোগ- ইটভাটার মালিকও তাদের বেশ কিছু জায়গা কেনার কথা বলে পুরো টাকা দেননি।

এদিকে, সরকারি সড়কের নিচ দিয়ে অভিযুক্ত জামায়াত নেতারা অবৈধভাবে সুড়ঙ্গ করে বালু উত্তোলনের পাইপ ঢুকিয়েছিলেন। খবরটি জানতে পেরে উপজেলা প্রশাসন সে পাইপ অপসারণের পর জব্দ করেছে।

জানা গেছে, উপজেলার আঙ্গারজুর গ্রামে সিলেট-ব্য়িানীবাজার-বারইগ্রাম সড়কের পাশ ঘেঁষে ২০১৬ সালে গড়ে তোলা হয় ‘কুশিয়ারা অটো ব্রিকস্ লিমিটেড’ নামের পরিবেশবান্ধব ইটভাটা। এসময় মুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মো. আবুল খায়ের ও জামায়াত নেতা মো. রুহুল আমিনসহ স্থানীয় আরও কয়েকজনের কাছ থেকে বেশ কিছু জায়গা খরিদ করা হয়। পরে ২০২০ সাল থেকে ‘কুশিয়ারা অটো ব্রিকস্ লিমিটেড’র  কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়ে এই জায়গায় বাধাহীনভাবে পরিচালনা করছিলেন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু চব্বিশের ৫ আগস্টের পর জামায়াত নেতাদের কাছ থেকে কেনা জায়গার মধ্যথেকে ৮৬ শতক জায়গা তারা জোরপূর্বক দখল করে নেন বলে ইটভাটা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। 

বিষয়টি স্থানীয়ভাবে একাধিকবার চেষ্টা করেও সমাধান না হওয়ায় গত বছর সিলেট অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন ‘কুশিয়ারা অটো ব্রিকস্ লিমিটেড’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মতিউর রহমান। তিনি বিয়ানীবাজারের পুরুষপাল গ্রামের মৃত মছিদ আলীর ছেলে। মামলায় মুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, বর্তমান উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও মুদালিয়া গ্রামের মৃত মতছিম আলীর ছেলে মো. আবুল খায়ের (৬০)-কে প্রধান আসামি এবং একই গ্রামের মো আব্দুল মতিনের ছেলে উপজেলা জামায়াত নেতা মো রুহুল আমিন (৪৭)-কে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে। এজাহারে এ দুজনসহ ৫জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ২/৩ জনকে। 

এ মামলায় মো. মতিউর রহমান অভিযোগ করে বলেন- তাদের বেদখলকৃত ৮৬ শতক জায়গায় কার্যক্রম চালাতে গেলে গত বছরের ২৪ অক্টোবর সকালে অভিযুক্তরা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিয়ে হানা দেয়। এসময় তারা ইটভাটা-সংলগ্ন সিলেট-বিয়ানীবাজার-বারইগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়ক কেটে অবৈধভাবে পাইপ স্থাপন করে কুশিয়ারা নদী থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ পানি ও বালু ইটভাটার মালিকানাধীন জমিতে জোরপূর্বক ফেলতে শুরু করে। এতে বালুর ও এর সাথে থাকা কাদা-পানি হুড়মুড় করে কুশিয়ারা অটো ব্রিকস ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢুকে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও উৎপাদিত সামগ্রীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়।

এসময় কারখানার শ্রমিক এবং কর্মরত দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রতিবাদ করলে অভিযুক্তরা তাদের প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করে। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসলে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। কিন্তু তারা ওই ৮৬ শতক জায়গার জবরদখল ছাড়েনি এবং ওই জায়গায় ইটভাটার কার্যক্রম এখনো পরিচালনা করতে দিচ্ছে না।

এ বিষয়ে ইটভাটা কর্তৃপক্ষ উচ্চ-আদালতে একটি রিটও করেন। এর প্রেক্ষিতে বিরোধপূর্ণ জায়গায় ১৪৪ ধারা জারি করেন আদালত। কিন্তু ইটভাটা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ- আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জামায়ত নেতারা তাদের অন্যায় কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। বর্তমানে ইটভাটার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রাণভয়ে আছেন।

এদিকে, সিলেট-ব্য়িানীবাজার-বারইগ্রাম সড়কের নিচ দিয়ে অভিযুক্ত জামায়াত নেতারা অবৈধভাবে সুড়ঙ্গ করে বালু উত্তোলনের পাইপ ঢুকিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন সে পাইপ দিয়ে তারা বালু এনে দখলকৃত ইটভাটার জায়গায় স্তুপ করে রেখে বিক্রি করছেন। খবর পেয়ে ৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনী এসে সে পাইপ কেটে বালু উত্তোলনের পথ বন্ধ করে দিয়ে তাদের সতর্ক করে যায়। কিন্তু এ বছর অভিযুক্ত জামায়াত নেতারা ফের পাইপ বসিয়ে বালু নিয়ে আসতে শুরু করেন। এ বিষয়ে ইটভাটা কর্তৃপক্ষ উপজেলা প্রশাসনে লিখিত অভিযোগ দিলে সম্প্রতি নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযান চালিয়ে সে পাইপ কেটে জব্দ করেছেন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রধান দুই অভিযুক্ত মুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির আবুল খায়ের এবং জামায়াত নেতা মো. রুহুল আমিন জানান- ইটভাটার জায়গা দখল করে রাখার অভিযোগটি মিথ্যা। তবে এখানে আরেকটি ইজারাদার পক্ষ বালু ফেলে রাখে তাদের ভাড়াকৃত জায়গায়। সে থেকে কিছু বালু বৃষ্টিতে ইটভাটার জায়গায় নিয়ে যায়, এ বিষয়ে আমাদের কোনো হাত নেই।

এই দুই জামায়াত নেতা পাল্টা অভিযোগ করে বলেন- বরং আমাদের মালিকানাধীন প্রায় ১৫ একর জমি ইটাভাটা কর্তৃপক্ষ কিনবেন বলে দখল করে ব্রিক ফিল্ড স্থাপন করেছেন। এখনো আমাদের টাকা পরিশোধ করেননি। এ বিষয়ে আমরা শীঘ্রই আদালতের দ্বারস্থ হবো।

সার্বিক বিষয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন- অবৈধভাবে সড়কের নিচ দিয়ে যে পাইপ স্থাপন করা হয়েছিলো সেটি আমরা অভিযান চালিয়ে অপসারণ করেছি। বর্তমানে সেটি বন্ধ আছে। আর ইটভাটা কর্তৃপক্ষের জায়গা দখলের বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান। মধ্যখানে মহামান্য আদালতের একটি স্থগিতাদেশ বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা (Stay Order) ছিলো, তবে সেটির মেয়াদ চলে গেছে। নতুন করে আবার আদালতের নির্দেশ আসলে আমরা সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তবে বিগত সময়ে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ থাকাকালে সেনাবাহিনী বিষয়টি পর্যবেক্ষণ এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।